যদি বউ সাজো গো

মনের মাধুরী দিয়ে অন্যকে সাজিয়ে তোলেন তাঁরা। তাঁদের হাতের সুনিপুণ ছোঁয়ায় আজকের বিয়ের কনে হয়ে ওঠেন অপরূপা। একদিন তাঁদের জীবনেও এসেছিল সেই দিন। সেদিন কেমন সেজেছিলেন তাঁরা? নিজেদের বিয়ের সাজের সেই অনুভূতি নিয়ে বলেছেন তিনজন রূপবিশেষজ্ঞ—গীতি’স বিউটি পারলার অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের গীতি বিল্লাহ, পারসোনার কানিজ আলমাস খান এবং ফেমিনা বিউটি পারলার অ্যান্ড হারবাল স্কিন কেয়ারের অঞ্জলী মোস্তফা
সাতজন মিলে বেটেছিলেন মেহেদি পাতা
গীতি বিল্লাহ

নতুন বউকে আলাদা করে চেনা যায় তার মেহেদিরাঙা হাতের চুড়ির রিনিঝিনিতে। কনের হাতে মেহেদির নকশা যেন চুপিচুপি কনের মনের কথাই জানান দেয়। আমাদের সময়ে টিউব মেহেদি না থাকাটাই বরং ভালো ছিল। সবাই মিলে দল বেঁধে মেহেদি পাতা তুলতে যাওয়ার মধ্যে একটা আনন্দ ছিল। নিজের বিয়ের সময় কনে পদাধিকার বলে সেই আনন্দ থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। আমার বিয়ের সে মেহেদি পাতা বেটেছিলেন সাতজন বিবাহিত নারী মিলে। মেহেদি বাটার পর আমার ডাক পড়ল। আমার হাতে মেহেদির নকশা করে দেন আমার মা, গাজী রাফিয়া খাতুন। রুপার কাঠিতে চুনের পানি দিয়ে নকশা এঁকে তার ওপর দেওয়া হয়েছিল মেহেদির প্রলেপ। চুনের নকশা কাটা অংশটা বাদে পুরো হাতে টকটকে সুন্দর রং ধরেছিল। মেহেদির এ রংটা অনেক দিন আমাকে নতুন বউ করে রেখেছিল।

বিয়েতে আমাকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন বড় বোন রূপবিশেষজ্ঞ জেরিনা আজগর। সোনালি সুতার বেনারসি কাতান শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে মেরুন আর সোনালি আভায় কাজল টেনে আপা আমার চোখ সাজিয়েছিলেন। চুলে করে দিয়েছিলেন রিং খোঁপা। সেখানে গুঁজে দেন লাল গোলাপ। কপালে আল্পনা ছাড়া তখন কেমন যেন অপূর্ণ থেকে যেত বিয়ের সাজ। এখন তো আমরা কনেকে আর আল্পনায় সাজাই না। কনেদের আমরা বিয়ের অনেক দিন আগে থেকেই সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। আমার বিয়ের সময় এ গুরুদায়িত্বটা ছিল আমার মায়ের ওপরই। তখন আমি বেশ পাতলা গড়নের ছিলাম। চিকন-পাতলা মেয়েটির ছিল মাথাভর্তি ঘন কালো চুল। মা আমার চুলে সব সময় সোন্দা ও মেথি বাটা লাগিয়ে দিতেন। এতে চুল মিষ্টি একটা ঘ্রাণ ছড়াত। আমার শাশুড়ি আমাকে না দেখলেও ওই গন্ধে নাকি টের পেতেন ‘গীতি আসছে’। বিয়ের পর এটা জেনে খুব মজা পেয়েছি! বেনারসি আর লাল টিপ যেন চিরায়ত বধূবেশ
কানিজ আলমাস খান


বধূবেশে বরের পাশে কানিজ আলমাস খান

পরনে লাল বেনারসি আর কপালে লাল টিপ। এ দুইয়ে মিলেই যেন বাঙালি নারীর চিরায়ত বধূবেশ। আজকের আধুনিক কনেও এ সাজে মানিয়ে যায় খুব সহজেই। আমার বিয়ের সাজও ছিল অনেকটা সে রকম। আমি সেজেছিলাম তখনকার বিউটি পারলার জেরিনা আজগরের লিভিং ডলে, সাজিয়ে ছিলেন গীতি বিল্লাহ। আমাদের সময়ের বিয়ের সাজে চল ছিল একটু চড়া মেকআপের। কনের চুলটা সামনের দিকে ফুলিয়ে পেছনে একটা সুন্দর খোঁপা করা হতো। কপালে করা হতো কুমকুমের আলপনা। সোনালি আর মেরুনে সাজানো হতো চোখ। নিরেট সোনার গয়নার এ সাজে খুব সহজেই চেনা যেত আমাদের সময়ের কনেদের। আমার বিয়ের সাজের কিছুটা কৃতিত্ব আমার বন্ধু মুনিয়া, ফারজানাদেরও দেওয়া উচিত। পারলার থেকে সেজে আসার পর আমার সাজ সুন্দর রাখার সার্বক্ষণিক দায়িত্বে ছিল মুনিয়া। আমার বৌভাতের অনুষ্ঠানে আমি সেজেছিলাম গুলশানের হংকং বিউটি পারলার থেকে।

এই সময়ের কনের সাজ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। বিয়ের শাড়ি ও সাজে এখন চিরায়ত লাল-মেরুনের সঙ্গে যোগ হয়েছে গোলাপি, আকাশি, সবুজ, নীল, কমলা, সাদা, সোনালি। বিয়ের গয়নার নকশা ও রঙে বৈচিত্র্য এসেছে। মেকআপটা এখন জমকালো হলেও চড়া নয়। চোখের সাজে যোগ হয়েছে স্মোকি ভাব। কনের চুলেরও এখন নানা সাজ। আমাদের সময়ের বিয়ের সাজটা নির্ভর করত যাঁরা সাজাতেন, তাঁদের ওপর। এখন আমরা কনের পছন্দ-অপছন্দকে বেশি গুরুত্ব দিই। সাজানোর আগে তাকে কোন সাজে ভালো দেখাবে, তা নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করি। প্রয়োজনে তাকে রিহার্সালেরও সুযোগ দিই। বিয়ের দিন সুন্দর সাজে সাজিয়ে তোলা কনেটি যেন আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী হিসেবে খুঁজে পায়।

অঞ্জলী মোস্তফার সাজানো বউ 

আজও আছে লাল বেনারসির সোনালি জরি অঞ্জলী মোস্তফা

বিয়ের সাজটি মানুষ সারা জীবন ধরে রাখে। মনের ফ্রেমে বন্দী সেই মুখখানি কখনোই যেন পুরোনো হয় না। যখনই আমি কনে সাজাই, তখন এ বিষয়টি খেয়াল রাখি। যতভাবে তাকে সুন্দর করে তোলা যায়! আমি শিল্পী মানুষ। গানের জগতে মজে থাকি বলেই হয়তো আমার মনটা শৈল্পিক। নিজে যেমন সাজতে ভালোবাসি, তেমনি অন্যকেও সাজাতে ভালোবাসি। আমার মনের সব মাধুরী ঢেলে আমি কনে সাজাই। সুন্দর একটা সাজ আমাকে অনেক বেশি ভালোলাগা দেয়।

আমাদের সময়ে অর্থাৎ সত্তরের দশকের কনে সাজ ছিল কমনীয় ও ঘরোয়া। কনের চোখে-মুখে ফুটে উঠত লাবণ্য। এ সাজের আরেক নাম দেওয়া যায় শৌখিন সাজ। গায়ে হলুদের দিন আমাকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন আমার জেনি খালা। হলুদের দিন আমি পরেছিলাম ফুলের গয়না। বিয়ের সাজ করেছিলাম সেই সময়ে ধানমন্ডি ৫ নম্বর সড়কের চীনা বিউটি পারলার মে ফেয়ার থেকে। লাল বেনারসি কাতান আর নিরেট সোনার গয়না আর লাল টিপে ছিল আমার কনে সাজ। বিয়ের কনের চুলের সাজে আমাদের সময় রিং খোঁপা খুব জনপ্রিয় ছিল। তখন সাজানোর উপাদান ছিল কম, তবে সাজটা ছিল ছিমছাম। সে তুলনায় অবশ্য এখনকার সাজ অনেক বেশি জমকালো। এখনকার সাজটাকে দক্ষ হাতের পরিচ্ছন্ন সাজ বলা চলে। মেকআপের মাধ্যমে এখন মুখাবয়ব তৈরি করে নেওয়া যায়। ঢেকে দেওয়া যায় ছোটখাটো খুঁত। এখনকার কনে সাজ হয় হাল ফ্যাশনের সঙ্গে মিলিয়ে। তবু আজও পুরোনো হয়ে যায়নি লাল বেনারসির সোনালি জরি!

অনুলিখন: তাওহিদা জাহান

0 comments:

Post a Comment

" কিছু স্বপ্ন আকাশের দূর নীলিমাক ছুয়ে যায়, কিছু স্বপ্ন অজানা দূরদিগন্তে হারায়, কিছু স্বপ্ন সাগরের উত্তাল ঢেউ-এ ভেসে যায়, আর কিছু স্বপ্ন বুকের ঘহিনে কেদে বেড়ায়, তবুও কি স্বপ্ন দেখা থেমে যায় ? " সবার স্বপ্নগুলো সত্যি হোক এই শুভো প্রার্থনা!

Follow me