প্রথম পাতা |
ফটো স্টুডিও |
আমার প্রতিদিন |
অনুভুতি |
উপদেশ |
স্বাস্থ্য |
তোমাদের ছবি |
শাড়ীতেই নারী |
আজকের বার্ত |
তোমার রুপ |
বাবা তোমায় ছালাম |
কবিতা |
সাহিত্য |
Showing posts with label বাবা তোমায় সালাম. Show all posts
Showing posts with label বাবা তোমায় সালাম. Show all posts
শুক্রবার, এগার ডিসেম্বর, পনের ।
শুক্রবার, এগার ডিসেম্বর, পনের ।
কেন তা জানিনা, তবে অন্যান্য দিনের চেয়ে খুব সকালেই ঘুম ভাঙল । সকাল নটার দিকে সিদ্ধান্ত হলো তোমাকে নিয়ে নিউমার্কেট যেতে হবে, তোমার নাকি অনেক কেনাকাটা আছে । এগারটা দিকে আমরা তোমাকে নিয়ে নিউমার্কেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । সিদ্ধান্ত নিলাম ধামরাই-গুলিস্তান এর গাড়ীতে যাবো, কারণ ঐ গাড়ীটা নিউমার্কেটের সামনে দিয়ে যায়, খুব সহজে তারাতারি যাওয়া যায় । কিন্তু তুমি বায়না ধরলে, না দোতালা বাস তোমার পছন্দ, তুমি দোতালা গাড়ীতেই যাবে এবং দোতালায় জানালার পাশে বসে যেতে তোমার ভাললাগে । তাই বাধ্য হয়ে দোতালা গাড়ীতেই তোমাকে নিয়ে জানালার পাশে বসলাম, গাড়ী চলতে লাগলো ।
আমি তোমাকে নিয়ে জানালার পাশে বসলাম । সামনের এক সীট পরে এক বয়স্ক ভদ্র লোক আর আমাদের পিছনের সীটে দুটো যুবতী মেয়ে বসেছিল । তোমার মনে পরেছে কি? আমার কোলে বসার সাথে সাথে আমি তোমাকে বলেছিলাম, সামনের সীটটা শক্ত করে ধরো এবং খেয়াল রেখো, গাড়ী ব্রেক করলে তোমার মুখে আঘাত লাগতে পারে । যদিও আমি তোমাকে খুব সামধানে ধরে রেখেছিলাম, তারপরও কথার ফাঁকে তোমার দাতে আঘাত লেগেছিল, কি তাও মনে করতে পারছোনা !
গাড়ী চলার সময় রাস্তার পাশে যাকিছু দেখেছো, শুধু প্রশ্নই করেছো, আমি অকপটে হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছি । হয়ত সে প্রশ্ন কমপক্ষে কয়েক হাজার । মাঝে মাঝে তোমার মা চুপ থাকতে বললেও আমি আবার বলতে বলেছি । কোন কথা হয়তো বহুবার জিগ্গাসা করেছো, বলেছি । সামনের ভদ্রলোক তোমার জানার কৌতুহল দেখে বলল “লট অফ কিউওরিসিটি” । তারপর একসময় নিউমার্কেটে পৌছে গেলাম ।
তুমি ভাবতে পারো এগুলো লিখে রাখার মানে কি? সত্যিই লিখে রাখার কোন মানে নেই । শুধু তোমাকে মনে করিয়ে রাখা ছাড়া । কারণ এখন তুমি একটা প্রশ্ন দশবার জিগ্গাসা করো, আমি রাগ করিনা, হাসিমুখে দশবারই জবাব দেই । সেদিন আমাকে অন্তত তিনবার জিগ্গাসা করার সুযোগটুকু দিও, রেগে যেওনা । আজ তুমি না বুঝে কৌতুহলবশত জিগ্গাসা করছো, আর সেদিন আমি কানে শুনতে পাবোনা বলে বাধ্য হয়ে জিগ্গাসা করবো । তাই শুধু মনে করিয়ে রাখতে চাই যে তোমার জীবনেও এমনদিন ছিল, যেদিন তুমি একই প্রশ্ন দশবার জিগ্গাসা করতে ।
তুমি হয়ত লক্ষ করবে, প্রতিবার ড্রেস কেনার সময় তোমার পছন্দের গুরুত্ব দিয়ে আমার সাধ্যের বাইরে গিয়েও কিনে দেওয়ার চেষ্টা করি । কেন জানো? কারণ তুমি একবারে হুট করে বড় হয়ে যাচ্ছোনা, যে অতীত ভুলে যাবে । যেহেতু ধীরে ধীরে বড় হচ্ছো, তাই আজকের দিনের কথা তোমার কিছুটা হলেও মনে থাকবে । আর যেদিন আমি তোমার উপর নির্ভরশীল হয়ে পরবো, সেদিন যেন অন্তত আমার মৌলিক চাহিদাটুকু আগ্রহ সহকারে পুরন করো ।
তুমি হয়ত লক্ষ করবে, প্রতিবার রেস্টুরেন্টে তুমি যখন তোমার পছন্দের্ পিতজা, চিকেন ফ্রাই, বার্গার এই তিনটা খাবার তৃপ্তি সহকারে খাও, আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবী, এই দিনটি আমার জীবনে কবে আসবে ! আদৌ আসবে কিনা ! কারণ আমার আজকের অবস্থানে তোমার দাদা ছিলোনা, আমি গ্রামে বড় হয়েছি । ভাবী আর চোখের কোন ভীজে যায়, যে যেদিন আমার পকেটে পয়সা থাকবেনা, কিংবা আয়ের সামর্থও থাকবেনা, সেদিন কি তুমি খাবারের অর্ডার দিয়ে এভাবে পরম মমতায় আমার খাবার অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকবে? নাকি দুবেলা ভাতের জন্যই চরম অনিশ্চয়তায় কাটবে আমার প্রতিটা মুহুত !
আজ আমার সাধ্য নেই তাই তোমাকে নিয়ে রিক্সায় ঘুরে বেড়াই । সেদিন হয়ত তোমার গাড়ী থাকবে । তবুও্ সময় পেলে মাঝে মাঝে আমাকে একটু রিক্সায় নিয়ে হসপিটালে, সেলুনে, মসজিদে নিয়ে যেও । আর আজকের এই ছোট্ট হাতটা যেদিন খুব শক্ত হবে, সেদিন আমার কোলের উপর দিয়ে রিক্সার অপর প্রান্তের হুকটা ধরে রেখো, আমি যেনো পরে না যাই । কারণ নিরাপত্তা দেওয়ার চেয়ে নিরাপত্তা নেওয়া অনেক বেশী আনন্দের ।
আমি জানি সেটা তুমি কখনোই পারবেনা । সময় তোমাকে পারতে দেবেনা । আমাকেও দেয়নি । তুমি টাকা দিয়ে হয়ত দিনের ভাল থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারবে, কিন্তু রাতের ঘুম এনে দিতে পারবেনা, পুরণ করতে পারবেনা তোমার শুন্যতা । যেমনটা আমি পারছিনা । আমি বুঝি আমার বাবাও পচিশ বছর আগে এই কথাগুলো ভাবতেন, হয়ত তখন ফেইসবুক বা কম্পিউটার ছিলনা, তাই লিখে রাখতে পারেননি । কিন্তু এমন জায়গায় লিখে রেখেছেন, যেটা কোনদিন মোছার নয় । মুছতে না পারার কষ্ট আর কাউকে না দেখাতে পারার কষ্ট, প্রতিনিয়ত দম বন্ধ করে দেয় । বিশ্বাস করো পাপা...সত্যিই খুব ভয় করছে, আজ আমার বাবা যে কষ্ট সহ্য করছে, আমি কি তা সইতে পারবো? না পেরেও বা উপায় কি? হয়ত সময়ই সহ্য করার মতো শক্তি আর ক্ষমতা তৈরি করে দেবে ! হ্যা তাই দিও...আজকের অবস্থা সেদিন থাকলে...সহ্য করতে পারবোনা ।
পাপা ! শুভ সকাল !
পাপা,
পাপা তুমি কেমন আছ ? সপ্তাহের যে দিনগুলো তুমি আমাদের কাছে না থাকো, আমি ও আম্মু তোমাকে খুব মিস করি ! তুমিও কি...... ?
পাপা জানো ! কখন মনে হয় তুমি পৃথিবীর সব চেয়ে ভালো পাপা ? যখন আমি বাইরে যেতে চাই-আম্মু বলে এখন আমার সময় নেই ! যখন আমি কিছু কিনতে চাই-আম্মু বলে টাকা নেই ! যখন গেমস খেলতে বসি-আর আমার কম্পিউটার টা খুব বিরক্ত করে কিংবা গেমসটা চলেনা ! যখন আমি পুলিশ আর অন্য গাড়িগুলোকে মেরে ফার্স্ট হই-আর আম্মু যখন আমার পিঠে হাত রেখে আদর করে 'থ্যাঙ্ক ইউ' বলেনা ! যখন আমি আইসক্রিম খেতে চাই - আম্মু বলে ঠাণ্ডা লাগবে ! যখন রিমোট নিয়ে দুষ্টামি করার জন্য কাউকে পাশে না পাই কিংবা যখন রাতে ঘুমাতে গিয়ে-মাঝখানে ঘুমাতে পারিনা !
পাপা জানো ! শনিবাবের সকালটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়, যখন ঘুম থেকে উঠে দেখি তুমি নেই ! তখন আমার খুব মন খারাপ হয়, আমার বন্ধুদের পাপা'দের মতো সবসময় তুমি আমার পাশে কেন থাকনা ? আমি জানি তুমি বলবা ! আমি যেদিন তোমার মত বড় হব, সেদিন এ প্রশ্নের উত্তর পাবো !
পাপা জানো ! আজকাল আরো একটা বিষয় নিয়ে মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হয়-আমি যখন তোমাক ফোন করি, তুমি কেটে দিয়ে আর ফোন করনা ! তখন খুব রাগ করি -মনে মনে ভাবি আর কখনো তোমাকে ফোন করব না ! পাপা তুমি কি এতই ব্যস্ত থাকো যে আমাকে একটা ফোনও করতে পারনা ?
পাপা জানো ! তুমি যে রং পেন্সিলগুলো কিনে দিয়াছ না, সেগুলো আম্মুর কিনে দেয়া পেন্সিলগুলো চেয়ে অনেক সুন্দর, ভালো ছবি আক যায় ! আমি তোমার জন্য অনেকগুলো ছবি একে রেখেছি, তুমি এসে 'গুড' দিয়ে দিও !
পাপা জানো ! তুমি যখন আমাদের কাছে থাকতা না, তখন আমি একটা 'ক' 'খ' ও লিখতে পারতাম না ! আর আজ আমি সব লিখতে ও পড়তে পারি, অথচ তুমি নেই ! কাল যখন তুমি আসবা, আমি তোমাক সব পড়ে শোনাব !
পাপা জানো ! কালকের দিনটা আমার কাছে খুব আনন্দের ছিল, কারণ কাল'ই প্রথম আম্মুক ছাড়া তোমার সাথে এত দুরে বেড়াতে গিয়াছি ! যখন তোমার পাশে দাড়িয়ে সৃতিসৌধটাকে খুব কাছ থেকে দেখলাম, ছবি তুললাম, জীবনের প্রথম দোতলা বাসে চরলাম, তোমার বুকে মাথা রেখে দুরপাল্লার গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, আমার খুব ভালো লাগছিল ! কিন্তু দুইটা কারণে আম্মুর জন্য মন খারাপ লাগছিল, কারণ আম্মু পাশে থাকলে আরো বেশী আনন্দ হত ! তাছাড়া আম্মু বার বার ফোন দিয়ে খবর নিতেছিল, কারণ আম্মুর আমার জন্য ভয় হইতেছিল ! আমি দুষ্টামি করি কিনা, পাপা ঠিক মত আমার দিকে খেয়াল রাখছে কিনা ইত্যাদি ! কিন্তু পাপা, আম্মু হয়ত জানেনা, এই পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে আমাকে তোমার চেয়ে বেশী নিরাপত্তা দিতে পারবে, আমাকে নিরাপদে আগলে রাখতে পারবে ! কারণ আমি যে তোমার প্রাণ, তুমি যে আমার সেরা পাপা !
শোন পাপা ! তুমি আগামী সপ্তাহে আসলে 'নিউ মার্কেট' এর সেই গাড়ির দোকানটাতে নিয়া আমাকে আরো একটা রিমোটওয়ালা গাড়ি ও একটা রংপেন্সিল কাটার কিনে দিবা, তারপর তোমাক নিয়ে আমার পছন্দের সেই রেস্টুরেন্ট এ যাব ! ঠিক আছে ? আমি জানি তুমি দিবা ! কারণ আমি যা যা চাই তুমি তাই আমাকে কিনে দাও, কারণ তুমি যে আমার 'ভালো পাপা' !
পাপা জানো ! তুমি যখন আমাদের কাছে থাকতা না, তখন আমি একটা 'ক' 'খ' ও লিখতে পারতাম না ! আর আজ আমি সব লিখতে ও পড়তে পারি, অথচ তুমি নেই ! কাল যখন তুমি আসবা, আমি তোমাক সব পড়ে শোনাব !
পাপা জানো ! কালকের দিনটা আমার কাছে খুব আনন্দের ছিল, কারণ কাল'ই প্রথম আম্মুক ছাড়া তোমার সাথে এত দুরে বেড়াতে গিয়াছি ! যখন তোমার পাশে দাড়িয়ে সৃতিসৌধটাকে খুব কাছ থেকে দেখলাম, ছবি তুললাম, জীবনের প্রথম দোতলা বাসে চরলাম, তোমার বুকে মাথা রেখে দুরপাল্লার গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, আমার খুব ভালো লাগছিল ! কিন্তু দুইটা কারণে আম্মুর জন্য মন খারাপ লাগছিল, কারণ আম্মু পাশে থাকলে আরো বেশী আনন্দ হত ! তাছাড়া আম্মু বার বার ফোন দিয়ে খবর নিতেছিল, কারণ আম্মুর আমার জন্য ভয় হইতেছিল ! আমি দুষ্টামি করি কিনা, পাপা ঠিক মত আমার দিকে খেয়াল রাখছে কিনা ইত্যাদি ! কিন্তু পাপা, আম্মু হয়ত জানেনা, এই পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে আমাকে তোমার চেয়ে বেশী নিরাপত্তা দিতে পারবে, আমাকে নিরাপদে আগলে রাখতে পারবে ! কারণ আমি যে তোমার প্রাণ, তুমি যে আমার সেরা পাপা !
শোন পাপা ! তুমি আগামী সপ্তাহে আসলে 'নিউ মার্কেট' এর সেই গাড়ির দোকানটাতে নিয়া আমাকে আরো একটা রিমোটওয়ালা গাড়ি ও একটা রংপেন্সিল কাটার কিনে দিবা, তারপর তোমাক নিয়ে আমার পছন্দের সেই রেস্টুরেন্ট এ যাব ! ঠিক আছে ? আমি জানি তুমি দিবা ! কারণ আমি যা যা চাই তুমি তাই আমাকে কিনে দাও, কারণ তুমি যে আমার 'ভালো পাপা' !
ঠিক আছে এখন রাখি পাপা ! তুমি আমাদের জন্য চিন্তা করনা ! প্রতিদিন আমাকে একবার ফোন দিও ! আমি মাঝে মাঝে ফোন নিয়ে বসে থাকি, একটাও তোমার ফোন আসেনা ! বাই পাপা !
তোমার বাধন
বাবা দিবস: প্রথম বিজয়ী লেখা- "এক পৃষ্ঠার সমুদ্র"
বাবা দিবস এলেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। আমার মা- যার কখনো লেখক হবার স্বপ্ন ছিলো না, কখনো কেউ তাঁকে বলেনি 'তোর লেখার হাততো অনেক ভালোরে!'
মা বলেন তাঁর জীবনটাই এক উপন্যাস। যে উপন্যাসের অক্ষর,শব্দ,কথা,আদরের যতিচিহ্নগুলো থেকে গেলো আলোকবর্ষ দূরে। আমার সেই মা-ই একদিন টুকিটাকি সাংসারিক চিঠি লেখার অবসরে, আয়-ব্যয়ের প্রাচীন চৌহদ্দি ছাড়িয়ে কি যত্নে লিখে ফেললেন এক পৃষ্ঠার স্মৃতিকথা। চোখে মুখে অনেকটা সংকোচ, অস্বস্তি আর দ্বিধার পাহাড় ছুঁয়ে আমার লেখার টেবিলের এক কোণে রেখে গেলেন সেই স্মৃতিকথা। আমি তখন ওয়েবসাইটে বাবা দিবসের রাশি রাশি ফিচার পড়ছি, গোপন ঈর্ষায় বলছি 'লেখার হাত কি ভালো!'
আমার মা কখনো লেখক ছিলেন না, অন্ততঃ আমি তাই মনে করতাম। হয়তো আমার মাও তাই মনে করেন, আর তাই কখনো জানতে চাননি যে বাবাকে নিয়ে লেখা সেই স্মৃতিকথা তাঁর লেখক মেয়ের কেমন লেগেছে।ব্যস্ত লেখক মেয়েও কোনদিন বলেনি জ্যৈষ্ঠ দিনের আচমকা সেই স্মৃতির ব্যাপারে অথবা লেখক মেয়ের অবহেলা কোথায় যেন সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে এক পৃষ্ঠার সেই স্মৃতিকথা। আমি খুঁজে পাইনি সেই পৃষ্ঠা আর কোনদিন। কোন এক অভিমানের মতো সে হারিয়ে গেছে সময়ের গভীরে, কিন্তু বাবাকে নিয়ে লেখা সেই স্মৃতিকথা আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। যেখানে লেখক ব্যর্থ হয় হয়তো সেখানে কন্যা ঠিকই জিতে যায় সাপলুডু খেলায়। আমার জানতে ইচ্ছে করে- খুব অভিমানে সেই অক্ষরগুলো হারিয়ে কোথায় গেছে? হয়তো অন্য আলোতে থাকা সেই বাবার কাছে চলে গেছে, হয়তো সেই বাবা জলের ভারী চশমা চোখে পৃষ্ঠার অক্ষরগুলো ছুঁয়ে দিচ্ছেন পরম আদরে...
বাবাকে নিয়ে আমার কোন স্মৃতি নেই, কিন্তু বুকের গভীরে কোথাও একটা স্মৃতিসৌধ আছে যার মুখোমুখি দাঁড়ালেই আমার বাবাকে মনে পড়ে। প্রাচীন ইতিহাসের দেয়ালে উঠে দাঁড়ায় এক জানালা। সেই জানালা কোনদিন আমাকে বাবার কাছে যেতে দেয়নি, কিন্তু স্পর্শ করতে দিয়েছে আমার বাবার আলোছায়াকে। বাবার কোন ছবি আমাদের কাছে নেই।
বাবা নাকি মাকে বলতো "হ্যাঁ, আমি যখন থাকবো না তখন আমার ছবি দেখে দেখে কাঁদো আর কি!"
বাবার ছবি দেখে কাঁদতে হয়নি আমাদের কিন্তু কান্না কি থেমে থাকে একটা ছবির জন্য? দেখতে পারার যেমন দুঃখ থাকে তেমনি না দেখতে পারারও তো এক ধরনের দুঃখবোধ থেকে যায়।
অনেক বছর পরে আমার মেয়ে সত্যজিত রায়ের 'ফেলুদা সমগ্র' থেকে একটা কথা আমাকে শুনিয়েছিল "যার যত বেশি ছবি তোলা হবে তার তত বেশি আয়ু কমে যাবে।" ওখানে কিসব ভাইটাল ফোর্সের স্থানান্তরের কথা ছিল। তার মানে হয়তো এই- আমার ‘আমি’ অন্যকিছুতে যত চলে যাবে তত আমি আমার নিজের অস্তিত্ব হারাবো। শুনে ভেবেছিলাম সত্যি যদি তাই হতো! এই ধারণা মতে আমার বাবারতো দীর্ঘকাল পৃথিবীর আলো দেখার কথা ছিল। হয়তো আমার বাবার ভাইটাল ফোর্স ছবির বদলে অন্য কোথাও, অন্য কোন স্মৃতিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল।
বাবার সাথে আমার জীবন কেটেছে তিন মাস আর বাবার স্মৃতির সাথে কেটেছে আমার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যের ভরাডুবি। আর অবশ্যই এই সময়ের বার্ধক্য যেখানে আমি বাবার থেকেও বয়সে বড় হয়ে গেছি। বাবা স্বপ্নে দেখেছিলো তাঁর একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে। স্বপ্ন দেখে খুব রাগ করলেন মায়ের উপর 'আমার এত সুন্দর মেয়ে হলো অথচ বউ একটা চিঠি লিখেও জানালো না! এবারো মেয়ে হওয়ায় জানায়নি?' বাবার রাগ আরো বাড়ে। তিন মাসের ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসার আগে স্বপ্নে দেখা মেয়ের জন্য কতকিছু কিনলেন। তখনো কমলালেবুর ন্যায় এই পৃথিবীটা জানেনি যে এটাই ছিল মেয়ের জন্য এক বাবার শেষ বাজার করা। আর কোনদিন কেনা হবে না মেয়ের জন্য শখের মাটির পুতুল, লালরঙ্গা সেলোয়ার কামিজ, কলাপাতা রঙের চুড়ি, বড়বেলার প্রথম শাড়ি...
বাবা বাড়ি এসে দেখে মেয়ে কোথায়! অন্তঃসত্ত্বা বউ উঠোন ঝাড়ে ব্যস্ত। নানীআম্মা বাজার-সদাই দেখেতো ক্ষেপে গেলেন 'সাপ-ই হয় না ব্যাঙ-ই হয় তার ঠিক নাই। মেয়ের জন্য দুনিয়ার বাজার করে নিয়া আসছে!" সাপ-ব্যাঙের রূপকথা ছাড়িয়ে ঠিক সে রাতেই আমি হলাম- বাবার স্বপ্নের মেয়ে। আমি যেন শুধু এই অপেক্ষাই করছিলাম বাবা কবে আসবে। শীতের রাতে বাবা আমাকে গোসল করাতে দিলেন না। নতুন তোয়ালেতে জড়িয়ে সারারাত বুকে নিয়ে কোরআন শরীফ পড়লেন। আমি বাবার বুক ছুঁয়ে ধর্ম পেলাম, পেলাম এক অচেনা ঈশ্বর যিনি লিখে রাখেন মানুষের পাওয়া আর না পাওয়ার কাহন।
এসব কথা আমার মনে থাকার নয়। আমি শুনেছি মায়ের কাছে, নানুর কাছে, আমার দাইমার কাছে। শুনতে শুনতে হারানো মানুষটাকে আমি নতুন করে দেখেছি, জেনেছি। এক সময় আমিই বাবার স্মৃতিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব নিয়েছি। এখন আমি আমার বাবার গল্প করি, আমার সন্তানের কাছে। আমার দুর্লভ ত্রৈমাসিক স্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবি- ছুটি কেমন তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। পাওয়া কেমন এক নিমেষে অনেক না-পাওয়ার দিকে ছুটে যায়!
"চাইল রবি শেষ চাওয়া তার কনকচাঁপার বনে/ আমার ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে।” বাবা ফিরে যাবার আগে মাকে বলেছিল কিছুদিনের মধ্যেই তোমাদের আমার কাছে নিয়ে যাব। বাবার শেষ চিঠিতেও ছিল সেই নতুন ঘরের গল্প "তুমি সব গুছিয়ে রাখো। আমি নিতে আসবো।" বাবা,তুমিতো আর নিতে এলে না আমাদের। শেষ পর্যন্ত তোমার নতুন ঘর হলো ঠিকই কিন্তু সেই ঘরে তুমি থেকে গেলে একা। তুমি ছাড়া আমাদের জীবন শুকিয়ে গিয়েছিল যেমন শুকিয়ে গিয়েছিল আমাদের গ্রামের সেই নদী। আমাদের স্মৃতিতে থেকে গেল আজন্ম গ্রীষ্মের দহন।
ফিরে গিয়েই বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা বলেছিল অপারেশন ভালো হয়েছে, কিন্তু আমাদের বাবা সুস্থ হয়ে আর ফিরে এলো না। মা সেই সময়টায় বাবার কাছে থাকতে পারেনি কেননা বাড়িতে নানীআম্মার বসন্ত, আমার অসুখ। কোন এক লেখক লিখেছিল “পৃথিবী ছেড়ে যাবার সময় অতি প্রিয় কাউকে জড়িয়ে ধরে থাকতে হয়।” আমার বাবার কি খুব ইচ্ছে করছিল প্রিয় কাউকে জড়িয়ে ধরে থাকার? বাড়িতে বাবাকে ফিরিয়ে আনার কোন ব্যবস্থা করতে না পারায় পরবাসেই বাবার শেষ সমাধি হলো। তাই আমাদের স্মৃতিতে কোন নিথর বাবা নেই- যে বাবা হাজার ডাকেও সাড়া দেয় না, বুকে তুলে নিতে পারে না আদরের খোকা-খুকীদের। খোকার স্মৃতিতে থেকে যায় বাবার গায়ে লেগে থাকে কান্তা সেন্টের ঘ্রাণ, বাবার ছড়া 'লেখাপড়া শিখবে হারুন/ দেখবে কত দেশ।" খুকীর স্মৃতিসৌধে থেকে যায় বাবার মুখে শোনা কোরআনের আয়াত- "এমরানের স্ত্রী যখন বললো হে আমার পালনকর্তা! আমার গর্ভে যা রয়েছে আমি তাকে তোমার নামে উৎসর্গ করলাম সবার কাছ থেকে মুক্ত রেখে। আমার পক্ষ থেকে তুমি তাকে কবুল করে নাও, নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত।"
বাবার মৃতদেহ আমি দেখিনি, বাবার কবরের মাটি কেমন হয় আমি জানিনা। বাবার কাছ থেকে আমার কোনদিন শোনা হয়নি রোদের গল্প, মেঘের গল্প। মা বলতেন তাঁর মেয়েরা বাবার আদর পায়নি। আমি সবাইকে শ্বশুর দেখে বিয়ে দেব। আমার বড় দুবোনের শ্বশুর ভাগ্য ভালো ছিল। কিন্তু আমার কপালটাই এরকম- বিয়ের মাত্র ক’মাস আগে তিনি মারা গেলেন। আমার কাউকে আর বাবা ডাকা হলো না। আমি আমার ছেলে মেয়ের জন্য ওদের দাদার কবরের মাটি নিয়ে আসি। দাদুর কবরের মাটি দাদুর আশীবার্দের মতো ওদের পাশে থাকে- এটা ওদের বিশ্বাস; আমারও বিশ্বাস। কিন্তু আমি আমার সন্তানের জন্য নানার কবরের মাটি আনতে পারি না, দিতে পারি না নানার আশীর্বাদের স্পর্শ।
অচেনা দূরের শহরে খুব কাছের মানুষের শেষ ঠিকানা কি আমার অদেখাই থেকে যাবে? কিন্তু স্বপ্নে বাবা আমার মুখোমুখি হয় ঠিক যেমন অনেক কাল আগে এক স্বপ্নে আমি বাবার মুখোমুখি হয়েছিলাম। বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে 'মা তুই কাঁদিস কেন? বাবা তোকে নাইওর নিতে আসব।' আহ্ বাবার স্পর্শ এত কোমল হয়! বাবার বুকে এত ছায়া থাকে! থাকে এত সমদ্রের জলহাওয়া! বাবাকে আমার কখনো দেখা হয়ে উঠে না; আমাদের মাঝখানে থেকে যায় সূক্ষ্ম এক দূরত্ব কিন্তু সেই দূরত্ব ছাড়িয়ে আসে বাবার ছায়া, স্পর্শ, সমুদ্রের গাঢ় বাতাস যার গভীরে প্রিয় বাবার গন্ধ। আমি বেদনার সমুদ্রে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকি বাবার সাথে নাইওর যাবার...
বাবা দিবস: দ্বিতীয় বিজয়ী লেখা- " দূরে থাকা ও অচেনা নিকটবর্তী "
১)
একটু বড় হওয়ার পর থেকেই আমার অপ্রিয় মানুষদের তালিকায় বাবা এক নাম্বারে না হলেও তিন-চারে ঠিকই বসে থাকতেন। ছোটবেলায়ও যে বাবাকে খুব পছন্দ করতাম-তা না। শৈশবে বাবাকে কাছে পাওয়া হয়নি খুব একটা। বাবার চাকরী ছিল কুমিল্লায়। আমি থাকতাম মায়ের সাথে; নানুবাড়ি। মনে আছে ছুটিতে বাবা আসবে শুনলেই অস্বস্তি শুরু হত। "বাবা" খুব একটা ভালো অভিজ্ঞতা ছিলেন না আমার জীবনে। বাবা মানেই হঠাৎ সতেরো ঘরের নামতা বলা, অথবা ভাত খাচ্ছি- একদলা শাক আমার প্লেটে তুলে দিয়ে কটমট করে তাকানো। না পারতাম খেতে, না পারতাম উঠে যেতে। মাঝে মাঝে কান্না চলে আসতো। কিন্তু কাঁদা যাবে না। আবিষ্কার করলাম কান্না চেপে রাখলে গলা ভার হয়ে যায়। সেই গলা দিয়ে শাক-ভাত নামার প্রশ্নই ওঠে না। অপেক্ষা করতাম বাবার খাওয়া শেষ হওয়ার। অথবা বিকেলে খেলতে যাব- বাবার হুঙ্কার, 'সারাটাদিন টইটই টইটই। একেবারে চামড়া তুলে ফেলব। বই নিয়ে বস।'
'চামড়া তুলে ফেলব' কথাটা বাবার খুব পছন্দের ছিল।
ছোটবেলা থেকেই বাবা এক অন্য মানুষ। আদরহীন, রুক্ষ, রোবটগোত্রের কেউ যার কিনা দু দু'টি চোখ থাকা স্বত্তেও একচোখা। ছোটবোন পিঠাপিঠি হওয়ায় প্রায়ই মারামারি লেগে যেতো। রিঙ্কির শেষ আশ্রয় ছিল বাবা। যত দোষই থাকুক বাবার কাছে সে ধোয়া তুলসি পাতা। যেন জগতের সব দোষ নিয়ে জন্মেছিলাম আমি। তপ্ত চোখে বাবা দাঁত কিড়মিড় করতেন। 'চামড়াটা এক্কেবারে তুলে ফেলব।' দাঁতে দাঁত ঘষাটা তার বকাবকির একটা অংশ ছিল। দেখলে মনে হবে এখনি বুঝি দুই-একটা দাঁত খুলে আসবে। কিন্তু বাবার দাঁত যথেষ্ঠ মজবুত ছিল। কত কত দিন বকা খেয়ে বাথরুমের ট্যাপ ছেড়ে কেঁদেছি তার ইয়ত্তা নেই। মনে হত কেউ আমাকে পছন্দ করে না। কেউ চায় না। আস্তে আস্তে বাবা দূরের মানুষ হতে থাকেন। 'দূরত্ব যতই হোক কাছে থাকুন'- এটা আসলে একটা বিজ্ঞাপনই।
বাবা একবার আমার ঘরে আসলেন। অস্বস্তি। খাটে বসলেন। লক্ষন সুবিধার না। 'বাবা' সামথিং ইজ রং। ভেরী রং। বাবার মুখ থেকে 'বাবা' শুনলেই বুঝতে হবে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে বা হবে। 'কত মানুষইতো ঈদ ঢাকায় করে। এবার আমরাও করি। কি বলিস?' বাবা থামেন। আমি কিছুটা অবাক কিছুটা হতাশ চোখে তার দিকে তাকাই। 'ঈদের পরই তো ফাইনাল পরীক্ষা। এখন বাড়ি যেয়ে কাজ নেই। পড়াশুনা কর।' কথাগুলো আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ঈদে নানুবাড়ি যাওয়া হবে না? অনেক কষ্টে চোখের পানি চোখেই আটকে রাখি। বাবা উঠে দাঁড়ালেন। 'বেঁচে থাকলে অনেক ঈদ আসবে।' ঈদের সালামি-নানুর সাথে নামাজে যাওয়া-সিফাত, রাহাদের সাথে দুষ্টামী- আর ভাবতে পারি না। চিবুক বেয়ে নামে নোনাপানি চিকন পথ ধরে। সবকিছুর জন্য এই মানুষটা দায়ী। এই বাবাটা। রাগে-দুঃখে হেঁচকির মত উঠতে লাগল।
কখনো কখনো কানে আসত বাবা-মার কথা কাটাকাটির শব্দ। মনে মনে আমি মায়ের পক্ষে থাকতাম সবসময়। আর আদালতে সাজা পেতেন বাবা। ইচ্ছে করত মাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাই; যেখানে বাবা, দাঁত কিড়মিড়ানো, চামড়া নিয়ে টানাটানি,ঝগড়াঝাটি কিছুই নেই। বাবার অনুপস্থিতির জগৎটা কেমন শান্তি শান্তি হবে তা ভেবেই পুলকিত বোধ করতাম।
সময় বয়ে যায় তর তর করে। শ্রাবনের দুরন্ত পাহাড়ী নদী যেন। বিরামহীন,একটানা আর একঘেয়ে। আর বাবাও বসে থাকলেন না। ধীর পদক্ষেপে হয়ে গেলেন আরো দূরের কেউ। যাকে চিনি কিন্তু পরিচয় নেই, তেমন একজন। তার সাথে কথাবার্তা হয় না তেমন। নিদেনপক্ষে সামনেই যাই না; অস্বস্তিভরে এড়িয়ে চলি। এড়িয়ে চলি না বলে শামুকের মত। খোলের মাঝে লুকিয়ে থাকি বলা যায়। হঠাৎ সামনে পড়ে গেলেও চোখে চোখ পড়ে না ভুলেও। কোন দরকার হলে মাকে দিয়ে বলাই।
মা মাঝে মাঝে বিরক্ত হন, 'তোর টাকা লাগবে- তোর বাবাকে বল। আমাকে বলে কি লাভ?'
'তুমি তারে বল।'
'তুই বলতে পারিস না?'
'না। দিলে দাও না দিলে নাই।'
দিন কেটে কেটে যেতে থাকে। মাঝে মাঝে দিনগুলো দ্রুতই যায়।
২)
ঝির ঝির করে চিকন ধারায় বৃষ্টি ঝরে। বৃষ্টি থামি থামি করেও থামার নাম বা গন্ধ কিছুই নিচ্ছে না। মাথার রুমালটা ভিজে চপচপ। বৃষ্টির হালকা ফোঁটায় চশমার কাঁচ ঝাপসা- যেন কেউ চশমার কাচটা শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষে দিয়েছে। ঝাপসা দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে থাকি। চোখ ঝাপসা, চশমার কাঁচ ঝাপসা- তাই সামনে একটা অস্পষ্ট সাদা মূর্তির মত দেখি। খাটিয়ায় শোয়ানো। অনেকটা লম্বা-সাদা কোলবালিশের মত। নানুর বাড়িতে এমন একটা কোলবালিশ ছিল। যদিও সেটা সাদা ছিল না। কি রঙের ছিল তা স্মরন নেই।
জয়নাল কাকা কানের কাছে তার পানখাওয়া মুখ নিয়ে আসেন। জর্দামাখা গরম বাতাস কানে ঝাপ্টা দেয়। কাকা ফিস ফিস করেন। 'বাবা, এইবার ভাইজানকে নামায়া দাও।'
'বাবা' শব্দটা হঠাৎ করে কানে লাগে। গলার নিচ থেকে কেমন জানি শূন্যতা অনুভব হয়। ধারনা হয় পাঁজরের হাড়ের নিচে কিছু নেই। হৃদপিন্ড, ফুসফুস-কিচ্ছু না। একটা কষ্ট যেন শূন্য বুক থেকে উপরে উঠতে গিয়ে গলায় এসে আটকে গেছে। ঢোক গিলতে কষ্ট হয়; ছোটবেলার মত। আমার মনে হয় আমি হাফপ্যান্ট পড়ে বসে আছি নানুবাড়ির খাওয়ার টেবিলে। বাবা সামনে বসে আছেন। আমার প্লেটে একগাদা শাক-ভাত। বাবার খাওয়া শেষ। কিন্তু উঠছেন না। আজ আমাকে আজ শাক-ভাত না খাইয়ে উঠবেন না।
৩)
তখন আমি বেশ ছোট। ছুটিতে বাড়ি আসলে বাবা কিছু কড়কড়ে নতুন দুই টাকার নোট দিতেন। পাঁচটা বা ছয়টা। 'নোটগুলা যত্ন করে প্যান্টের পকেটে রেখে দে। এরা বাচ্চা দিবে।'
'সত্যি?' কিছুটা অবিশ্বাসী অনেকখানি উত্তেজিত গলায় বাবাকে জিজ্ঞেস করতাম।
বাবা হ্যাঁ-সূচক হাসি হাসেন।
ভয়ে ভয়ে টাকাগুলো হাফপ্যান্টের পেছনের পকেটে রাখতাম; সাবধানে। একটু পরপরই গুনতাম। কিসের বাচ্চা কিসের কি? যা ছিল তাই আছে। বাবাকে বললে অপেক্ষা করতে বলতেন। পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই প্যান্টের পকেটে হাত দিতাম। আসলেই দু'টাকার নোট বাচ্চা দিয়েছে। একটা বা দু'টা নোট বেশি।
সবাইকে টাকার জন্মবৃত্তান্ত বলে বেড়াতাম। বাবা হাসতেন। একসময় বাবা চলে যেতেন। নোটগুলো আর বাচ্চা দিত না। আমি প্রতিটাদিন গুনতাম। তারা ততদিনে বন্ধ্যা হয়ে গেছে।
মুখের ভেতরটা তেতো লাগে। বাতাসের অক্সিজেন যেন বেশ খানিকটা ভারী ঠেকে।
নিঃশ্বাসগুলো পালিয়ে যেতে চায়।
বুদ্ধি হবার পর বাবাকে একবারই কাঁদতে দেখেছিলাম। সেদিন আমার রেজাল্ট দিয়েছিল। এসএসসির। বাবাও আমার সাথে স্কুলে গিয়েছিলেন। আমিতো ভয়েই শেষ, নার্ভাসিত হয়ে এতটুকু হয়ে গিয়েছি। রেজাল্ট খারাপ না। এ-প্লাস। রেজাল্ট জানার পর বাসায় আসা পর্যন্ত রিকশায় বাবা একহাত দিয়ে শক্ত করে আমাকে ধরে রেখেছিলেন আর অন্যহাতের রুমাল দিয়ে একটু পর পর চোখ মুছছিলেন। আমি অস্বস্তি নিয়ে সারাপথ চুপ করে ছিলাম। কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগছিল।
৪)
'বাবা, আর দেরী করা ঠিক হবে না।'
আমি আস্তে করে পা বাড়াই। পা বাড়াই খাটিয়ার দিকে। যার উপর বাবা অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করছেন আমাকে নিস্তার দিতে। যিনি আর কখনো দাঁতে দাঁত ঘষবেন না, চোখ রাঙ্গাবেন না, বলবেন না চামড়া তুলে ফেলার কথাও। আর কখনো......বাবার ভয়ে জুবুথুবু হয়ে থাকতে হবে না, ঘরে এখন ইচ্ছেমত চলাফেরা
করা যাবে।......
হাত-পায়ে যেন কোন বোধ নেই। নড়তে চায় না। দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষন কষ্ট হয়। ইচ্ছে করে মাটিতে বসে পড়ি; চিৎকার করে বৃষ্টি ঝরাই। নাহলে কষ্টগুলো নিজেরাই বেরিয়ে পড়বে হয়তবা; একজন আমৃত্যু দূরের কারো জন্য।
বৃষ্টি বড় বড় ফোঁটায় পড়তে শুরু করে। দূরের মানুষটাকে আরো দূরে ঠেলে দিতে গিয়ে মনে হয় আসলে কিছু মানুষ এতই কাছে থাকে যে তাদের দূরের মানুষ বলে ভুল হয়। এরা থাকে নিজের থেকেও কাছে। 'বাবা...' ধরা গলায় এটুকুই বলতে পারলাম। আরো কিছু হয়ত বলার ছিল। গলার জালে আটকে যায় বাকীটা। কেইবা শুনবে??
বাবা দিবস: তৃতীয় বিজয়ী লেখা- "একজন নিতান্তই সাধারণ বাবার গল্প"
১৯৮৭ সালের কোন এক মঙ্গলবার। একজন ভদ্রলোক প্রথমবারের মতন বাবা হতে যাচ্ছেন। তাঁর মনে একই সাথে আনন্দ ও উৎকন্ঠা। নির্দিষ্ট সময়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে ভূমিষ্ঠ হলো তার প্রথম পুত্র সন্তান। কোথায় তিনি আনন্দিত হবেন, অথচ সেই সুযোগ তাঁর হলো না। তারঁ স্ত্রী সুস্থ্ আছেন,সমস্যা হলো তাঁর সদ্যভূমিষ্ঠ ছেলেটিকে নিয়ে। বাসার পাশেই এক চিকিৎসক বললেন- নবজাতকের অবস্থা সংকটাপন্ন, দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। বাবা ছুটলেন তার ছেলেকে নিয়ে পিজি হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানালেন- এই শিশুর লাইফ সাপোর্ট লাগবে,নয়তো বাঁচানো যাবে না।
সে যাত্রা অবশ্য শিশুটি বেঁচে গেলেও,যতই বড় হতে থাকে সেই ছেল শিশুটি কিছুতেই হাঁটছিলো না। জানা গেলো,সে “ওয়ের্ডনিগ হফম্যান ডিজিজ” নামে স্নায়ুর এক রোগে আক্রান্ত,সেই সাথে তার শরীরের মাংসপেশীর গঠনও একদম ঠিকভাবে হচ্ছিলো না। ভদ্রলোককে অনেক আত্মীয়-স্বজন বললেন,”এই ছেলেকে দিয়ে কি হবে,বড় হয়ে শুধু বোঝা বাড়বে। এর চেয়ে কোন এতিম খানায় রেখে আসুন,মাসে মাসে টাকা দিবেন।“ ভদ্রলোক এক হুঙ্কারে তাদের থামিয়ে দিলেন,”আমার ছেলে একদিন আপনাদেরকেও ছাড়িয়ে যাবে ইনশাল্লাহ,দেখে নিবেন।“
অবশেষে স্রষ্টার অসীম অনুগ্রহে আর বাবা-মার ভালোবাসা নিয়ে ছেলেটি তিন বছর বয়সে হাঁটা শুরু করে। যদিও হাঁটতে গিয়ে কিছুটা সমস্যা কিন্তু তার থেকেই যায়। সেই বাবা তার ছেলেকে সবসময় বলতেন,”কেউ তোর হাঁটার সমস্যা নিয়ে হাসাহাসি করলে মন খারাপ করবি না। মনে রাখবি,মানুষের আসল জোর হলো মনের জোর। “ বাবার সেই কথাগুলো মাথায় ঢুকিয়ে প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়ে স্কুলে যেত ছেলেটি। অনেক সময়ই পায়ের জন্মগত সমস্যার জন্য ব্যালেন্স হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তো রাস্তায়। তারপর বাবার কথাগুলো মনে করে আবার উঠে দাঁড়াতো। এভাবে ছেলেটি স্কুল-কলেজ পার হয়ে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।
বাবা সব সময় বলতেন তার ছেলেকে,” বাপ রে, একটা কথা মাথায় রাখবি- কোনদিন কারো উপকার করতে না পারিস,ক্ষতি করিস না। যতটুকু সম্ভব দেশের জন্য ভাল কিছু করতে চেষ্টা করবি।“ নিজের বাসায় এক লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন সেই ভদ্রলোক। নিজের জীবনে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছেন প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে। হয়তো অনেক উঁচুতে নয়,কিন্তু সম্মানজনক একটা অবস্থানে অবশ্যই। তাঁর মতে, এই পথ চলাতে একমাত্র অনুপ্রেরণা ছিল বই। সেই ভদ্রলোক কি জানেন যে নিজের অজান্তেই বই পড়ার নেশাটুকু তিনি তার ছেলের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন?
এই হলেন আমার বাবা। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের চাকরি জীবনে একটি টাকাও ঘুষ না খেয়ে নিজ অফিসে এক উদাহরণ তৈরি করেছেন। অনেকের দৃষ্টিতে বাবা হয়তো সম্পদহীন। কিন্তু সততা আর নিজের সন্তানদের ভেতর অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা আর ভাল কাজের প্রতি সম্মানবোধ তৈরি করে দিতে পেরেছেন। আর শিখিয়েছেন,বিপদে কিভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হয়।
আজো আমরা সব ভাই-বোন অনেক বড় হয়ে গিয়েছি,কিন্তু বাবা এখনো আমাদের এমনভাবে স্নেহ করেন যেন আমরা সেই ছোট্টটি রয়ে গিয়েছি। যখন জীবনযুদ্ধে নানা সমস্যায় মন বলে হেরে যাব,তখন শান্ত-সৌম্য এই চেহারার মানুষটির চেহারা মনে ভেসে ওঠে। মন বলে-”না কিছুতেই হেরে যাওয়া চলবে না।“
বাবা গতবার পবিত্র হজ্ব পালন করে এসেছেন। সেখানকার একটা ঘটনা আজো আমাকে নাড়া দেয়। বাবাদের হজ্ব কাফেলার সদস্যরা মক্কায় যে বাড়িতে ছিলেন,তার মালিক ছিল এক পাকিস্তানী নাগরিক। সে বাবাদের কাছে ভাড়া নিত কড়ায় করায় গণ্ডায়, যদিও পানি-গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহের ঠিক ছিল না মোটেই। এটা নিয়ে বাবা ও অন্যরা অভিযোগ জানালে ঐ লোক বলে,”আমি তোমাদের চেয়ে দৈহিকভাবে শক্তিশালী,তোমরা কি করতে পারবে শুনি?” আর আমার আব্বু নাকি তখন শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন,”আমরা কি করতে পারি সেটা তোমার দাদা-পরদাদা ইয়াহিয়া-ভুট্টো-টিক্কা খানকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো...” বলাই বাহুল্য যে সেই এক কথাতেই সমস্যা সমাধান হয়ে গেল।
বাবা, কখনো তোমাকে বলা হয় নি যে,তোমাকে অনেক বেশি ভালবাসি। হয়তো তুমি খুব সাধারণ একজন ছা-পোষা মানুষ,কিন্তু তুমি কি জানো তোমার মতো সাধারণ হতে হলেও অনেক “অসাধারণ” হতে হয়?
" কিছু স্বপ্ন আকাশের দূর নীলিমাক ছুয়ে যায়, কিছু স্বপ্ন অজানা দূরদিগন্তে হারায়, কিছু স্বপ্ন সাগরের উত্তাল ঢেউ-এ ভেসে যায়, আর কিছু স্বপ্ন বুকের ঘহিনে কেদে বেড়ায়, তবুও কি স্বপ্ন দেখা থেমে যায় ? " সবার স্বপ্নগুলো সত্যি হোক এই শুভো প্রার্থনা!















